জারবেরা ডেইজি চাষ: রোগ প্রতিরোধ ও পরিচর্যা

জারবেরা ডেইজি  পবিত্রতা, উৎফুল্লতা, বিশুদ্ধতা ও একনিষ্ঠ প্রেমের প্রতীক হিসেবে পৃথিবীর কোটি মানুষের বুকে জায়গা করে নেয়া ফুলের নাম। ১৭৩৭ সালে ফুলটির আবিষ্কারক ট্রউবট জারবার (Traugott Gerber) একজন জার্মান ডাক্তার ও শৌখিন বৃক্ষ বিশারদের নাম অনুযায়ী ফুলটির নামকরন জারবেরা রাখা হয়। ফুলটি এস্টেরিস বা ডেইজি গোত্রীয় হওয়ায় এর নামকরন হয় করা জারবেরা ডেইজি।

জারবেরা ডেইজি বীরুৎ প্রজাতির উদ্ভিদ। এর আদিবাস বা উৎপত্তিস্থল হিসেবে দক্ষীন আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষীন আমেরিকা ও তাসমানিয়া বনাঞ্ছল অভিহিত করা হয়। জারবেরা ফুলের শীর্ষভাগ ডেইজির মতনই বলা চলে, তবে আধুনিক কৃষি ব্যাবস্থা একে নতুন বিন্যাস দিয়ে আরোও সজ্জিত করেছে।

আজকের এ লেখনীর মাধ্যমে আমরা জারবেরা ডেইজি’র প্রকৃতি, চাষাবাদ, যত্ন, রোগ প্রতিরোধ পদ্ধতি সহ অজানা অনেক তথ্য জানবো যা আমাদের জারবেরা চাষে উৎসাহী করবে।

জারবেরা ডেইজি’র বৈশিষ্ট্যাবলী

জারবেরা একটি বহুবর্ষজীবী  বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটির গড় উচ্চিতা ৩০ থে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয় যা চাষের মাটি, পানি, সূর্যালোক, খাবার ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।সারা বছর ফুল ফুটলেও মূলত এপ্রিল মে মাসে এ ফুল বেশি ফুটতে দেখা যায়। সাধারনত উজ্জ্বল রঙ এর ফুল ও পালং শাকের অনুরুপ পাতা হয়। একটি গাছ গড়ে ৭০ থেকে ৮০ টি পর্যন্ত ফুল দিয়ে থাকে। যদিও” IJHAF” এর মতে এ সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ হয়।সুন্দর এই ফুলটি বেশ আকর্ষণীয়ও বটে। এখানে জারবেরা ফুলটি সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেখবো যা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না।

  • এমি স্টুয়ারট এর “ফ্লাওয়ার কনফিডেনশিয়াল” বইটিতে জারবেরা ডেইজি কে পৃথিবীর ৫ম জনপ্রিয় ফুল হিসেবে অবিহিত করা হয়। একই তথ্য দেয়া আছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুল পরিচিতি প্লাটফর্ম https://www.interflora.co.uk তেও।
  • সারাবছর আহরনযোগ্য বলে ফুলটি বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে সজ্জার কাজে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
  • এমি স্টুয়ারট এর মতে শুধুমাত্র আমেরিকাতে প্রতি বছর ২০০ মিলিয়ন জারবেরা বিক্রয় করা হয়। 
  • টিউলিপের রাজধানী খ্যাত নেদারল্যান্ড এ  প্রতি বছর ৯০০ মিলিয়ন জারবেরা উৎপাদিত হয় যা প্রায় ৬০০ টি ভিন্ন রঙ এর হয়।
  • জারবেরা ৩০ প্রজাতির মতান্তরে ৪০ প্রজাতির হয়ে থাকে। এর মধ্যে জারবেরা জেমসনি’ই চাষের জন্য মাঠে ফলানো হয়।
  • আধুনিক কৃষিতে “জারবেরা জেমসনির” সাথে “জারবেরা ভিরিডিফোলিয়া” ও অন্যান্য জারবেরার হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন রঙ সম্পন্ন আধুনিক জারবেরার উৎপাদন করা হয়।
  • সূর্যমুখী ফুলের মত জারবেরা ও সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে।
  • কাটা অবস্থায় ফুলদানীতে সঠিক যত্নে জারবেরা ৭ থেক ১০ দিন পর্যন্ত বাচতে পারে।।

জারবেরা ডেইজি চাষ আদ্যোপান্ত

পলিনেট হাউজে জারবেরা ডেইজি চাষ

IJHAF জার্নাল এর সূত্রমতে বাংলাদেশের সর্বমোট ৪২৫০ থেকে ৪৫৭০ হেক্টর চাষভুমি তে ফুল চাষ করা হয়, যার ৩২১০ থেকে ৩৪৫০ হেক্টর ভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল চাষ করা হচ্ছে, অবশিষ্ট ১০২০ থেকে ১০৪০ হেক্টর চাষভূমিতে ফলানো হচ্ছে  নানান ধরনের সাজ-সজ্জার পাতা জাতীয় গাছ।  যা থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় এদেশের বাজারে ফুলের বিপুল চাহিদার চিত্র।

জারবেরা চাষ অবশ্যই একটি লাভজনক ব্যবসা। “জারবেরা জেমসনি বোলাস” একটি লাভজনক গাছ যা জৈবিক( বীজ, অঙ্গ) ও অজৈবিক উপায়েও বংশ বিস্তার করে বা করানো যায় (কানওয়ার এন্ড কুমার ২০০৮)। সঠিক অবকাঠামো তৈরি করে সঠিক পরিচর্যায় এ গাছ রোপনের ৭ থেকে ১০ সপ্তাহ ফুল দেয়।

উপযুক্ত জাতের সঠিক চারা নির্বাচন

ফুল চাষের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো উপযুক্ত জাত ও সঠিক চারা নির্বাচন। বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য “জারবেরা জেসমনি বোলাস” দারুন উপযুক্ত। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইন্সটিউট দুটি জারবেরার জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হলো-  “বারি জারবেরা-১” ও “বারি জারবেরা-২”।

 এ গাছ বীজ ও অঙ্গজ উভয় প্রক্রিয়ায় বংশ বিস্তার করতে পারে। উপযুক্ত জাতের চারা নির্বাচন সফলতার হার কয়েকগুন বৃদ্ধি করতে পারে। এজন্য স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ বড় সহাহয়ক হতে পারে। বাংলাদেশে প্যারাগন লিমিটেড গাজীপুর এ পলি নেট হাউজে জারবেরা চাষ করছে।এছাড়া কৃষিবিদ ড. শায়েখ সিরাজ এর “হৃদয়ে মাটি ও মানুষ” অনুষ্ঠানের বেশ কিছু জারবেরা চাষ সম্পর্কিত গাইডলাইন রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইন্সটিউট এর বিক্রয় কেন্দ্র বা সরকারি নার্সারি গুলোতে বারি জারবেরা ১ ও ২ পাওায়া যায়। 

সরাসরি চারা আহরন করলে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে চারা যেনো সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত হয়।

চারা কেনার পর সরাসরি রোপন করতে চাইলে কমপক্ষে ২ মাস পূর্বে কাজ শুরু করতে হবে। কারন পলিনেট গ্রীনহাউজ তৈরি করে তাতে পানি বা সেচের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ০ হতে ২৫ দিন ও মাটির বেড তৈরি করতে ২সপ্তাহ লাগতে পারে। 

আবহাওয়া

জারবেরা চাষের জন্য ২৫ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস আদর্শ তাপমাত্রা বলে বিবেচিত হয়। এর অধিক তাপমাত্রায় ফুল  আসে কিন্তু ফুল সঠিক গুনসম্পন্ন না হবার শঙ্কা বেশি  থাকে। এজন্য গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে এ গাছ পলিণেট হাউজে করা হয়।কিছু কিছু পলিনেট গ্রীনহাউজে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে ফগার মেশিনের বহুল ব্যাবহার পলক্ষিত হয়। বাজেট বেশি থাকলে গ্রীন হাউজ ও করা যেতে পারে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে আংশিক (৩০%) ছায়ার ব্যাবস্থা করেও আশানুরুপ ফলাফল লাভ করা সম্ভব। 

জারবেরা ডেইজি’র মাটি তৈরি

মাটি তৈরি ফুল চাষের পূর্ব ও  মূল উপাদান গুলোর একটি। মাটি ভালো হলে ফুল ও গাছ রোগমুক্ত থাকে, ফুলের ডাটা সবল হয়, ফুলের গঠন ভালো হয়। আদর্শ মাটির তিনটি উপাদান থাকা বাঞ্চনীয়। এক ভাগ বালি, এক ভাগ মাটি ও এক ভাগ জৈব সার। বেলে দোআঁশ বা দো-আশ মাটি বাংলাদেশ এ সুনিষ্কাশিত মাটি হিসেবে বহুল জনপ্রিয়। তবে বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন কৃষি সার্ভিসের মতে জারবেরা চাষের ক্ষেত্রে মাটির পিএইচ ৫.৫০ থেকে ৭.০০ এর মধ্যে থাকা উচিত। জারবেরার জন্য ৫.৫০ থেকে ৬.৫০ মাত্রার মাটি উপযুক্ত হিসেবে অভিহিত করে। চাষাবাদের জন্য নির্ধারিত জমির মাটি অবশ্যই ল্যাবে পাঠিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। মাটি তৈরি করে মাটির জীবাণু ধ্বংস করতে হবে। এজন্য মাটি তে সরাসরি কিছু প্রয়োগ না করে ম্যাট্রেস পদ্ধতি ব্যাবহার করা শ্রেয়। 

মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব সার, পাতা পচা, কোকোডাস্ট, বালু প্রয়োগ করে মাটিকে ৪০ থেক ৪৫ সেন্টিমিটার গভীর করে কয়েকটি চাষ দিতে হবে।

সারপ্রয়োগ

হেক্টর প্রতি ২ টন কোকোডাস্ট, ১০ টন গোবর বা কম্পোস্ট, ৩৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ২৫০ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি বোরিক এসিড ও জিংক অক্সাইড, ৩০০ কেজি মিউরেট অব পটাশ যুক্ত করতে হবে। রোপনের ১০ থেকে ১৫ দিন পূর্বে গোবর ও কোকোডাস্ট ও ৭ থেকে ১০ দিন পূর্বে অন্যান্য সার কিন্তু ইউরিয়া অর্ধেক জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া চারা রোপনের ২৫ দিন পর গাছের গোড়ায় দূরে প্রয়োগ করতে হবে।

বেড তৈরি

বেড তৈরি করতে হবে ২০ সেমিঃ উচু করে যেনো গাছের গোড়ায় পানি জমতে না পারে ও প্রশস্ততা হবে ১ থেকে ১.২ মিটার।  দুই বেডের মাঝে ৫০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত নালা তৈরি করতে হবে যা পানি নিষ্কাশনের জন্য অপরিহার্য। যেহেতু তৈরির পর বেডগুলো হতে টানা ২ বছর ফুল আহরন করা হবে তাই বেড নির্মাণে অধিক যত্নশীল হওয়া বাঞ্চনীয়( বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন) । 

গাছ রোপন

প্রতি ৫০ সেমি বাই ৪০ সেমিতে সারি করে গাছ রোপন করতে হবে।রোপনের সময় গাছের ক্রাউন যেনো মাটি মাটি স্পর্শ না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে অন্যথায় গাছে পচন (ফুট রোট) রোগ ধরতে পারে।জারবেরা সাধারনত সারা বছর হলেও সঠিক গুনগতমান ও অধিক ফলনের নিমিত্তে এ গাছ অক্টোবর নভেম্বর মাসে রোপন করা উচিত। 

প্রয়োজনীয় সেচ

ড্রিপ ওয়াটারিং এক্ষেত্রে আদর্শ বিবেচিত হলেও এতে সনাতন পদ্ধতির সেচ ও দেয়া যায়। আমরা এখানে দুই পদ্ধতি নিয়েই বলবো। 

ড্রিপ ওয়াটারিং সিস্টেম হলো গাছের ঊপর থেকে একেবারে সেচ না দিইয়ে গাছের গোড়ায় পাইপের সাহায্যে ফোটায় ফোটায় জল সেচ দেয়া। এ পদ্ধতিতে গাছ প্রতি ৩.৭ লিটার পানি হিসেব করে ১৭ থেকে ২০ মিনিট দিনে তিনবার  সেচ দেয়া উচিত। 

সনাতন পদ্ধতি অবলম্বন করলে প্লাবন পদ্ধতিতে তিনবার সেচ দেয়া উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়। এতে গোড়ায় পচন ধরতে পারে। আবার সেচের অভাবে গাছ ডলে পড়োতে পারে যা গাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 

পানির পিএইচ ৬.৫ থেকে ৭ এর বেশি হওয়া উচিত না। পানিতে ক্লোরিন বা ব্লিচিং থাকলে তা সেচের কাজে ব্যাবহার করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে পানি বিশুদ্ধ করতে না পারলে কোন পাত্রে পানি দুইদিন জমিয়ে রেখে তার উপরের দিকের পানি সেচে ব্যাবহার করতে হবে। মাটিতে যেন বাতাস প্রবেশে বাধা না পায় সেজন্যে সেচের পর মাটিতে জো এলে মাটির উপরিভাগের শক্ত আবরন ভেঙে বা নিড়ানি দিয়ে আলগা করে দেয়া উচিত। ( জাতীয় তথ্য বাতায়ন)

সঠিক যত্ন

রোগ বালাই দমন না করলে এ গাছ থেকে সফল হবার সম্ভাবনা কমে যায়। জারবেরা ডেইজি’র প্রধান রোগ গুলো হলোঃ 

মূল পচা ও গোড়া পচা

জারবেরা ডেইজির ক্ষেত্রে এরোগ দুটি খুবই সার্বজনীন। এর প্রতিষেধক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে রিডোমিল অথবা ডায়থেন এম-৪৫ ছত্রাকনাশক ০.২% হারে  ৭-১০ দিন প্রয়োগ করা যায়। তাছাড়া ৫% হারে প্রয়োগ করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়। 

পাউডারি মিলিউড

গাছের উপর সাদা পাউডারের মত দেখায় এ ছত্রাককে। বেনোমিল ৫০ ডব্লিওপি ০.০১% হারে প্রয়োগ করলে এ ছত্রাক থেকে মুক্তি মেলে।

মাকড় 

মাকড়ের আক্রমন রোধে মাকড়নাশক ভারমিটেক বা ওমাইট ৫৭ ইসি ১.৫ মিলি হারে গাছে স্প্রে করতে হয়। রোগ শুরুর দিকে আক্রান্ত পাতা ফেলে দিলেও মাকড়ের আক্রমন থেকে নিস্তার ঘটে। 

সাদা মাছি

এ মাছি দমনে হলুদ রঙ এর আঠালো ফাদ ব্যাবহার করা হয়। তবে নিম বীজ ভাঙা ৫০ গ্রাম ১ লিটার পানিতে ৭ দিন ভিজিয়ে রেখে পাতার নিচের দিকে স্প্রে করলে এ মাছির উৎপাত কমে যায়।

ফুল আহরণ

সঠিক যত্নে প্রতিটি গাছ হতে ৭০ থেকে ৮০ টি ফুল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি বছর একটি গাছ হতে ২৫-৩০ টি ফুল সংগ্রহ করা যায়, সে হিসেবে দুই বছরে ৫০-৬০ টি। ফুল সংগ্রহের আগে হাপোক্লোরাইট লবন দ্রবন স্প্রে করলে ফুলের স্থায়িত্ব বাড়ে। ফুল সাধারণত এর ডাল সহ কেটে নেয়া হয়, যথাসম্ভব লম্বা ডাল রেখেই কাটার নিয়ম। লম্বা ডালের আগায় ফুল এর আকর্ষণ বৃদ্ধি করে। ফুলদানীতে দীর্ঘস্থায়ী হবার জন্যে ফুলের নিচের প্রায় এক ইঞ্চি পরিমান ডাল পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। এভাবে ফুলটি প্রায় ৭ দিন পর্যন্ত ফুলদানীতে সজীব থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *